নব্বইয়ের দশকের ক্রাশ থেকে ওটিটি কাঁপানো ডিভা: সেলুলয়েড ও বাস্তবে রবীনা ট্যান্ডনের এক অবিশ্বাস্য লড়াই

 


বলিউডের রুপোলি দুনিয়ায় প্রতিভাদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তবে কিছু তারকা এমন থাকেন, যারা পরিস্থিতির চাকা ঘুরে গেলেও নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল থাকেন। হিন্দি সিনেমার এমনই এক চিরসবুজ ও অদম্য নাম রবীনা ট্যান্ডন (Raveena Tandon)।

এক সময় যার নাচের ছন্দে পুরো ভারত মেতে উঠত, বর্তমান ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগেও তার অভিনয় সমানভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করছে। তিনি কেবল গ্ল্যামারাস নায়িকাই নন, বরং একজন জাতীয় পুরস্কার জয়ী অভিনেত্রী এবং বাস্তব জীবনের এক সাহসী সিঙ্গেল মাদার। কোনো সিনেমাটিক স্ক্রিপ্টের চেয়েও তার নিজের জীবনের গল্প অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ও অনুপ্রেরণাদায়ক।


১. অক্লান্ত পরিশ্রমের সেই দিনগুলো এবং কারিশমার সাথে ফানি 'প্র্যাঙ্ক'১৯৯১ সালে 'পাত্থর কে ফুল' ছবি দিয়ে বলিউডে তার যাত্রা শুরু হয়। এরপর 'মোহরা' ও 'লাডলা'-র মতো সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি দর্শকদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেন। বৃষ্টির ব্যাকগ্রাউন্ডে হলুদ শাড়িতে তার সেই আইকনিক নাচ আজও হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সেরা রোমান্টিক গানগুলোর একটি।


তবে সেই সময়ের সাফল্যের পেছনের গল্পটা ছিল প্রচণ্ড খাটুনির। রবীনা ট্যান্ডন এবং কারিশমা কাপুর দুজনেই শেয়ার করেছেন যে, নব্বইয়ের দশকে তারা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেন। একের পর এক শিফটে একই দিনে ৪ থেকে ৬টি ছবির শুটিং সামলাতে হতো। গাড়ি বা যাতায়াতের পথেই চলত কস্টিউম বদলানোর কাজ!


আন্দাজ আপনা আপনা’ সিনেমার শুটিং সেটে তাদের কথা না বলার সেই বিখ্যাত রটনা ভেঙেছিল এক মজার ঘটনায়। এক রাতের শুটিংয়ে তাদের দুজনকে একটি পিলারের সাথে পিঠাপিঠি করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। এরপর ডিনার ব্রেকে ইউনিটের সবাই মজা করে তাদের ওই অবস্থায় ফেলেই চলে যান! দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার পর ক্ষিদে ও ক্লান্তিতে রবীনা নিজেই কারিশমাকে প্রথম জিজ্ঞেস করেছিলেন—"জুস পিয়েনি?" (Juice piyegi?)। ব্যাস, ওখানেই জমে থাকা সব বরফ গলে যায় এবং তাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়।


২. ছকভাঙা সিদ্ধান্ত: ক্যারিয়ারের শীর্ষে যখন সিঙ্গেল মাদাররবীনা কেবল পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সাহস রেখেছিলেন। ১৯৯৫ সালে যখন তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ একা দুটি কন্যাসন্তানকে (পূজা ও ছায়া) দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।


আজকের প্রগতিশীল সমাজেও একজন অবিবাহিত নারীর পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কঠিন। আজ থেকে তিন দশক আগে রবীনা সেই মানসিক শক্তি দেখিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে এর কী প্রভাব পড়বে, সেই ভয় উপেক্ষা করে তিনি দুই মেয়েকে নিজের মাতৃস্নেহে বড় করে তোলেন।


৩. গ্ল্যামারের খোলস ছেড়ে 'জাতীয় পুরস্কার' ও 'পদ্মশ্রী' জয়কেবল কমার্শিয়াল সিনেমার রোমান্টিক নায়িকার তকমাতেই রবীনা আটকে থাকেননি। ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া 'দমন' সিনেমায় বৈবাহিক হিংসার শিকার এক গৃহবধূর চরিত্রে তার অভিনয় দেখে সমালোচকরা স্তব্ধ হয়ে যান। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে তার ঝুলিতে আসে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award)। পরবর্তীতে তার এই দীর্ঘ শৈল্পিক অবদানকে সম্মান জানিয়ে ভারত সরকার তাকে মর্যাদাপূর্ণ 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত করে।

৪. ব্যক্তিগত ঝড় ও নতুন অধ্যায়ের সূচনানব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে অক্ষয় কুমারের সাথে তার প্রেম ও বাগদানের খবর ছিল বি-টাউনের সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয়। তবে সেই সম্পর্ক সুখের পরিণতি পায়নি। ব্যক্তিগত জীবনের সেই বড় ধাক্কা ও মিডিয়ার কাটাছেঁড়া সামলে রবীনা নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ডিস্ট্রিবিউটর অনিল থাদানির সাথে তিনি সুখের সংসার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার কন্যা রাশা থাদানি-র বলিউডে পা রাখার মুহূর্তেও তিনি একজন আদর্শ মেন্টর ও মা হিসেবে ছায়ার মতো পাশে আছেন।


৫. ওটিটি-র নতুন রানি এবং বর্তমান ব্যস্ততাবয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা মাত্র, তা রবীনাকে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। নেটফ্লিক্সের 'আরণ্যক' সিরিজে দাপুটে পুলিশ অফিসার কস্তুরী ডোগরা কিংবা 'কর্ম কলিং'-এ ধূসর শেডের চরিত্রে তার রাজকীয় অভিনয় প্রমাণ করেছে যে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের রাশও এখন তার হাতে।

বর্তমানে বড় পর্দাতেও তার ব্যস্ততা তুঙ্গে। একদিকে যেমন মাল্টি-স্টারার কমেডি ড্রামা 'ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল' সিনেমায় দীর্ঘ সময় পর অক্ষয় কুমারের সাথে তার অন-স্ক্রিন রি-ইউনিয়ন ঘটছে, অন্যদিকে সাউথের প্যান-ইন্ডিয়া ছবি 'বিশ্বনাথ অ্যান্ড সন্স'-এও তিনি চমক দিতে প্রস্তুত। রুপোলি পর্দার বাইরেও সহ-অভিনেত্রীদের ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলে তিনি বারবার প্রমাণ করেন যে তিনি একজন সত্যিকারের ফাইটার।


শেষ কথা:

রবীনা ট্যান্ডনের জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের ওপর ভরসা রাখলে প্রতিবারই বিজয়ী হয়ে ফিরে আসা সম্ভব। তিনি শুধু বিনোদন জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, বরং নিজের শর্তে মাথা উঁচু করে বাঁচা কোটি মানুষের এক সত্যিকারের অনুপ্রেরণা।


আপনার মন্তব্য জানান:রবীনা ট্যান্ডনের অভিনয় করা কোন সিনেমা বা গানটি আপনার জীবনের অন্যতম প্রিয়? নব্বইয়ের দশকের গ্ল্যামারাস ডিভা নাকি আজকের ওটিটি-র শক্তিশালী অভিনেত্রী—কোন রবীনাকে আপনার বেশি ভালো লাগে? নিচে কমেন্ট করে আপনার মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করুন!



Comments

Popular posts from this blog

Aishwarya Rai Bachchan — a shining name for both beauty and acting talent.

ক্যানভাসে আঁকা ক্লাসিক্যাল সৌন্দর্য: ঐশ্বর্য রাই

ঐশ্বর্য রাই: রূপের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য আত্মমর্যাদার উপাখ্যান 👑✨