অমিতাভ বচ্চন: ভারতীয় চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমিতাভ বচ্চন কেবল একজন অভিনেতার নাম নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রূপালী পর্দায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছেন। ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে (বর্তমান প্রয়াগরাজ) জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা খ্যাতনামা কবি হরিবংশ রাই বচ্চন এবং তেজি বচ্চনের জ্যেষ্ঠ পুত্র।
প্রারম্ভিক জীবন ও লড়াই
১৯৬৯ সালে খাজা আহমেদ আব্বাসের 'সাত হিন্দুস্তানি' ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তবে শুরুর পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ শারীরিক গঠন এবং গম্ভীর কণ্ঠস্বরের কারণে প্রথম দিকে তিনি বারবার প্রত্যাখ্যাত হন। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হলেও তিনি হাল ছাড়েননি।
'অ্যাংরি ইয়াং ম্যান' যুগ
১৯৭৩ সালে প্রকাশ মেহরার 'জঞ্জির' ছবিটি তাঁর অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমাজ ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক সৎ অথচ ক্রুদ্ধ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে 'অ্যাংরি ইয়াং ম্যান' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এরপর একে একে উপহার দেন কালজয়ী সব চলচ্চিত্র:
* দিওয়ার (১৯৭৫): নৈতিক দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক আবেগের মেলবন্ধন।
* শোলে (১৯৭৫): ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা বাণিজ্যিক হিট।
* ত্রিশূল ও ডন (১৯৭৮): স্টাইল ও ধারালো সংলাপে ভরপুর অবিস্মরণীয় অভিনয়।
* মুকাদ্দর কা সিকান্দার (১৯৭৮) ও কুলি (১৯৮৩): ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে দর্শকের মনে গভীর ছাপ।
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় ও ছোট পর্দা
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আর্থিক ক্ষতি ও ক্যারিয়ারের সাময়িক স্থবিরতার মুখে পড়লেও তিনি দমে যাননি। ২০০০ সালে ছোট পর্দায় 'কৌন বনেগা ক্রোড়পতি' (KBC)-র সঞ্চালক হিসেবে তাঁর প্রত্যাবর্তন টেলিভিশন জগতের ইতিহাস বদলে দেয়। একই সাথে তিনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নতুনভাবে পর্দায় হাজির হন। 'মহব্বতেঁ', 'ব্ল্যাক', 'পা', 'পিকু' এবং 'পিঙ্ক'-এর মতো সিনেমায় ভিন্ন স্বাদের ও বয়সের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভা।
সম্মাননা ও ঐতিহ্য
তিনি একাধিকবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শিল্পকলার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান 'দাদাসাহেব ফালকে' পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।
বয়সকে হার মানিয়ে তিনি আজও সমান উদ্যমে কাজ করে চলেছেন। তাঁর নিখুঁত কাজের প্রতি নিষ্ঠা, অনন্য বাচনভঙ্গি এবং গভীর কণ্ঠস্বর তাঁকে ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় বানিয়ে তুলেছে।

Comments
Post a Comment