সুরের ইন্দ্রজাল: 'সা রে গা মা পা' থেকে লতা মঙ্গেশকরের উত্তরসূরি শ্রেয়া ঘোষাল
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে এমন কিছু কণ্ঠ আসে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। নব্বইয়ের দশকের এক শান্ত স্বভাবের মিষ্টি মেয়ে থেকে আজকের বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী—শ্রেয়া ঘোষালের এই যাত্রা কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, সঙ্গীতের প্রতি একনিষ্ঠ সাধনার এক অনন্য উদাহরণ।
মঞ্চ থেকে মায়ানগরী: 'সা রে গা মা পা' ও বনশালীর জহুরি চোখ
২০০০ সালের দিকে ভারতের জনপ্রিয় সঙ্গীত রিয়্যালিটি শো 'সা রে গা মা পা' (তৎকালীন 'সা রে গা মা')-এর মঞ্চে যখন কিশোরী শ্রেয়া গান গাইছিলেন, তখন হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেননি ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের ইতিহাস বদলাতে চলেছে। সেই মঞ্চে তাঁর সুরের সূক্ষ্ম কাজ ও নির্ভুল তান নজর কেড়েছিল বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বনশালীর। বনশালীর মা লীলা বনশালীও টিভিতে শ্রেয়ার গান শুনে মুগ্ধ হন।
পরবর্তী অধ্যায়টি রূপকথার চেয়ে কম নয়। বনশালী তাঁর স্বপ্নের প্রজেক্ট 'দেবদাস' (২০০২)-এ পারোর কণ্ঠ হিসেবে বেছে নেন অনামী, নতুন এই তরুণীকেই। মাত্র ষোলো বছর বয়সে ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ঠোঁটে "বৈরি পিয়া", "সিলসিলা ইয়ে চাহাত কা", কিংবা "ডোলা রে ডোলা"-র মতো জটিল ও ভারী শাস্ত্রীয় ধাঁচের গানে শ্রেয়ার কণ্ঠ ঝড় তুলল। প্রথম ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার জিতে তিনি প্রমাণ করলেন, তিনি ক্ষণিকের চমক নন—দীর্ঘপথের পথিক।
লতা মঙ্গেশকরের উত্তরসূরি: ঐতিহ্যের সেতু
ভারতীয় সঙ্গীতে লতা মঙ্গেশকর একটি মহীরুহ। তাঁর স্থান কারও পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়, তবে আধুনিক যুগে লতাজির নিখুঁত সুরবোধ, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং আবেগ প্রকাশের ঐতিহ্যের সবচেয়ে যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে যাঁকে গণ্য করা হয়, তিনি শ্রেয়া ঘোষাল।
- সুর ও তানের বিশুদ্ধতা: লতাজির গায়কীর মূল স্তম্ভ ছিল 'সুরলিপির নিখুঁত উপস্থাপন' এবং অতি উচ্চ গ্রামেও কণ্ঠের মধুরতা ধরে রাখা। শ্রেয়ার পরিবেশনাতেও একই ধরনের স্নিগ্ধতা ও অনায়াস স্বচ্ছতা লক্ষ্য করা যায়।
- শব্দোচ্চারণের গভীরতা: লতাজির মতো শ্রেয়াও যে ভাষায় গান গান—হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু বা মালয়ালম—প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত মাধুর্য বজায় রাখেন নিখুঁতভাবে।
- আধুনিকতার ছোঁয়ায় মেলবন্ধন: শ্রেয়া অন্ধ অনুকরণ করেননি; বরং লতাজির ক্লাসিক্যাল ভাবধারাকে আত্মস্থ করে তাতে নিজের নিজস্ব স্বকীয়তা ও আধুনিক অভিব্যক্তি যুক্ত করেছেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে ক্লাসিক্যাল ঠুমরি, মেলোডিয়াস রোমান্টিক গান থেকে দ্রুত লয়ের ড্যান্স নাম্বার—সব মাধ্যমেই শ্রেয়া ঘোষাল আজ এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। রিয়্যালিটি শো-এর ছোট্ট প্রতিযোগী থেকে সুরসাম্রাজ্ঞীর আসনে তাঁর এই পৌঁছানো প্রমাণ করে, ট্রেন্ডের ভিড়েও খাঁটি সাধনা ও সুরের জয় চিরন্তন।

Comments
Post a Comment